কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে নাঙ্গলকোটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। যুবদলের চার নেতাকে কেন্দ্র করে ‘চার খলিফা’ প্রসঙ্গটি এখন আর নিছক হাস্যরসের বিষয় নয়; এটি দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক আনুগত্য, ক্ষমতার ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
সাংসদের বক্তব্যের সারকথা হলো—জাতীয় নির্বাচনের আগে বহিষ্কৃত যুবদলের চার নেতা তাঁর নির্দেশিত বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁদের ভূমিকা ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা প্রকাশ্যে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সংসদ সদস্যের এমন বক্তব্য কি কেবল আত্মপক্ষ সমর্থন, নাকি এর মধ্যে স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে আরও গভীর কোনো বার্তা রয়েছে?
প্রশ্ন উঠছে, খলিফা’ পরিচয়, নাকি ক্ষমতার প্রতীক?
‘খলিফা’ শব্দটি নিজে কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসরে যখন কোনো জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ চারজনকে ‘চার খলিফা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন বিষয়টি নিছক শব্দের অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তাঁরা কি কেবল সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি স্থানীয় রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ও ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন?
একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের ঘনিষ্ঠতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বরং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিশ্বস্ত কর্মীদের ভূমিকা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতা যদি জনমনে বিশেষ ক্ষমতাবলয় তৈরির ধারণা সৃষ্টি করে, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার করা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরই দায়িত্ব।
কারণ, জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আস্থাভাজন হওয়া আর জনগণের কাছে জবাবদিহির বাইরে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া এক বিষয় নয়।
এদিকে বহিষ্কৃত নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্নটি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে বহিষ্কৃত বলে আলোচিত নেতারা কীভাবে এবং কোন সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন?
যদি তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে, তাহলে দলীয় গঠনতন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক বিধিবিধানের আলোকে তাঁদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সংসদ সদস্য হিসেবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা এক বিষয়, আর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সাংগঠনিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কেউ অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন—এটি তাঁর রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু অতীতের অবদান কি বর্তমানের সব সিদ্ধান্তের বৈধতা নিশ্চিত করে? নিশ্চয়ই নয়। রাজনীতিতে অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দলীয় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, সংশ্লিষ্ট নেতাদের দায়িত্বের পরিধি, তাঁদের নিয়োগের ভিত্তি এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
দুর্নীতির প্রমাণ দিন, কিন্তু জবাবদিহি কার?
সাংসদ বলেছেন, চার নেতার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে প্রকাশ্যে মতামত দিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়—এ কথা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য।
কিন্তু জবাবদিহির দায়িত্ব কি শুধু নাগরিকের? জনগণ তথ্য দেবে, অভিযোগ তুলবে—তারপর জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা নেবেন। এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
যাঁরা সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের দায়িত্বের পরিধি কী? তাঁরা কোন কর্তৃত্বে কাজ করছেন? তাঁদের কর্মকাণ্ড তদারকির ব্যবস্থা কী? অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবেন কে? ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও রয়েছে। সুশাসন কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা নয়; এটি নিয়ম, প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আর ‘নাকে খত দিয়ে এমপি পদ ছেড়ে দেওয়ার’ মতো কঠোর প্রতিশ্রুতি জনমনে তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা।
সাংসদের বক্তব্যে ফেসবুকে সমালোচনা না করার বিষয়ে সতর্কবার্তাও রয়েছে। তিনি ‘ফেসবুকে সুড়সুড়ি’ দিয়ে সমালোচনার করা থেকে.বিরত থাকার সতর্কবার্তা দেন এবং আরো বলেন, কেউ খলিফা’ হতে চাইলে স্বাগত জানাবেন। বক্তব্যের এই অংশটি নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহনন অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু তাই বলে সব সমালোচনাকে ‘সুড়সুড়ি’ কিংবা সুশাসন ব্যাহত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায় না।
জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। সমালোচনা গ্রহণ করা, তথ্যের ভিত্তিতে জবাব দেওয়া এবং ভুল হলে সংশোধন করা—এসবই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের পরিচয়।
তবে নাগরিকের সমালোচনারও দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ হলে তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ থাকা উচিত; গুজবকে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, সমালোচনাকারীকে ভয় দেখানো বা তাঁর বিরুদ্ধে অস্পষ্ট শাস্তির ইঙ্গিত দেওয়ার পরিবর্তে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাই শ্রেয়।
নাঙ্গলকোটের সাধারণ মানুষ কি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে বেশি আলোচনা করবে, নাকি কারা সাংসদের ঘনিষ্ঠ এবং কারা তাঁর নির্দেশে কোন দায়িত্ব পালন করছেন—তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?
‘চার খলিফা’ নিয়ে আলোচনা যদি জনমনে এমন ধারণা তৈরি করে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তি রয়েছেন, তাহলে সেই ধারণা দূর করার দায়িত্ব সাংসদেরই। তিনি চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয়, কাজের পরিধি এবং জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট করতে পারেন। তাতে অযথা বিতর্ক কমবে, জনগণের মাঝে খলিফা আতংক কমে বরংআস্থা বাড়বে।
একজন সংসদ সদস্যের শক্তি তাঁর চারপাশের অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাঁর প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় জনগণের আস্থা, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং জনস্বার্থে কাজ করার সক্ষমতা দিয়ে।
এখন নাঙ্গলকোটের মানুষ ‘চার খলিফা’র গল্প শুনে শুধু হাস্যরস খুঁজছে, নাকি এর আড়ালে ক্ষমতার নতুন বলয় তৈরির আশঙ্কা দেখছে—সেটি বোঝার জন্য প্রয়োজন বাস্তব কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন। কাউকে অপরাধী বলা যেমন প্রমাণ ছাড়া অনুচিত, তেমনি কোনো জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ বলেই কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংসদ মোবাশ্বের আলম যদি সত্যিই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ হন, তাহলে তাঁর সামনে সুযোগ রয়েছে—কথার পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার প্রমাণ করার। অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান, দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা এবং সমালোচনার প্রতি সহনশীলতা নিশ্চিত করাই হবে তাঁর জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
কারণ, জনগণ কোনো ‘খলিফা’ চায় না, যারা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে। জনগণ চায় এমন নেতৃত্ব, যেখানে ক্ষমতা থাকবে দায়িত্বের সঙ্গে, রাজনৈতিক আনুগত্য থাকবে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে, আর জনপ্রতিনিধিত্ব থাকবে জনগণের কাছে জবাবদিহির অধীনে।
নাঙ্গলকোটে ‘চার খলিফা’র গল্প যতই মুখরোচক হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষ গল্পের চেয়ে কাজের হিসাবই দেখতে চাইবে।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে নাঙ্গলকোটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। যুবদলের চার নেতাকে কেন্দ্র করে ‘চার খলিফা’ প্রসঙ্গটি এখন আর নিছক হাস্যরসের বিষয় নয়; এটি দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক আনুগত্য, ক্ষমতার ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
সাংসদের বক্তব্যের সারকথা হলো—জাতীয় নির্বাচনের আগে বহিষ্কৃত যুবদলের চার নেতা তাঁর নির্দেশিত বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁদের ভূমিকা ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা প্রকাশ্যে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সংসদ সদস্যের এমন বক্তব্য কি কেবল আত্মপক্ষ সমর্থন, নাকি এর মধ্যে স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে আরও গভীর কোনো বার্তা রয়েছে?
প্রশ্ন উঠছে, খলিফা’ পরিচয়, নাকি ক্ষমতার প্রতীক?
‘খলিফা’ শব্দটি নিজে কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসরে যখন কোনো জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ চারজনকে ‘চার খলিফা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন বিষয়টি নিছক শব্দের অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তাঁরা কি কেবল সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি স্থানীয় রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ও ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন?
একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের ঘনিষ্ঠতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বরং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিশ্বস্ত কর্মীদের ভূমিকা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতা যদি জনমনে বিশেষ ক্ষমতাবলয় তৈরির ধারণা সৃষ্টি করে, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার করা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরই দায়িত্ব।
কারণ, জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আস্থাভাজন হওয়া আর জনগণের কাছে জবাবদিহির বাইরে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া এক বিষয় নয়।
এদিকে বহিষ্কৃত নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্নটি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে বহিষ্কৃত বলে আলোচিত নেতারা কীভাবে এবং কোন সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন?
যদি তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে, তাহলে দলীয় গঠনতন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক বিধিবিধানের আলোকে তাঁদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সংসদ সদস্য হিসেবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা এক বিষয়, আর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সাংগঠনিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কেউ অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন—এটি তাঁর রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু অতীতের অবদান কি বর্তমানের সব সিদ্ধান্তের বৈধতা নিশ্চিত করে? নিশ্চয়ই নয়। রাজনীতিতে অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দলীয় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, সংশ্লিষ্ট নেতাদের দায়িত্বের পরিধি, তাঁদের নিয়োগের ভিত্তি এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
দুর্নীতির প্রমাণ দিন, কিন্তু জবাবদিহি কার?
সাংসদ বলেছেন, চার নেতার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে প্রকাশ্যে মতামত দিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়—এ কথা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য।
কিন্তু জবাবদিহির দায়িত্ব কি শুধু নাগরিকের? জনগণ তথ্য দেবে, অভিযোগ তুলবে—তারপর জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা নেবেন। এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
যাঁরা সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের দায়িত্বের পরিধি কী? তাঁরা কোন কর্তৃত্বে কাজ করছেন? তাঁদের কর্মকাণ্ড তদারকির ব্যবস্থা কী? অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবেন কে? ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও রয়েছে। সুশাসন কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা নয়; এটি নিয়ম, প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আর ‘নাকে খত দিয়ে এমপি পদ ছেড়ে দেওয়ার’ মতো কঠোর প্রতিশ্রুতি জনমনে তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা।
সাংসদের বক্তব্যে ফেসবুকে সমালোচনা না করার বিষয়ে সতর্কবার্তাও রয়েছে। তিনি ‘ফেসবুকে সুড়সুড়ি’ দিয়ে সমালোচনার করা থেকে.বিরত থাকার সতর্কবার্তা দেন এবং আরো বলেন, কেউ খলিফা’ হতে চাইলে স্বাগত জানাবেন। বক্তব্যের এই অংশটি নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহনন অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু তাই বলে সব সমালোচনাকে ‘সুড়সুড়ি’ কিংবা সুশাসন ব্যাহত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায় না।
জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। সমালোচনা গ্রহণ করা, তথ্যের ভিত্তিতে জবাব দেওয়া এবং ভুল হলে সংশোধন করা—এসবই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের পরিচয়।
তবে নাগরিকের সমালোচনারও দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ হলে তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ থাকা উচিত; গুজবকে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, সমালোচনাকারীকে ভয় দেখানো বা তাঁর বিরুদ্ধে অস্পষ্ট শাস্তির ইঙ্গিত দেওয়ার পরিবর্তে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাই শ্রেয়।
নাঙ্গলকোটের সাধারণ মানুষ কি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে বেশি আলোচনা করবে, নাকি কারা সাংসদের ঘনিষ্ঠ এবং কারা তাঁর নির্দেশে কোন দায়িত্ব পালন করছেন—তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?
‘চার খলিফা’ নিয়ে আলোচনা যদি জনমনে এমন ধারণা তৈরি করে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তি রয়েছেন, তাহলে সেই ধারণা দূর করার দায়িত্ব সাংসদেরই। তিনি চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয়, কাজের পরিধি এবং জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট করতে পারেন। তাতে অযথা বিতর্ক কমবে, জনগণের মাঝে খলিফা আতংক কমে বরংআস্থা বাড়বে।
একজন সংসদ সদস্যের শক্তি তাঁর চারপাশের অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাঁর প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় জনগণের আস্থা, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং জনস্বার্থে কাজ করার সক্ষমতা দিয়ে।
এখন নাঙ্গলকোটের মানুষ ‘চার খলিফা’র গল্প শুনে শুধু হাস্যরস খুঁজছে, নাকি এর আড়ালে ক্ষমতার নতুন বলয় তৈরির আশঙ্কা দেখছে—সেটি বোঝার জন্য প্রয়োজন বাস্তব কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন। কাউকে অপরাধী বলা যেমন প্রমাণ ছাড়া অনুচিত, তেমনি কোনো জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ বলেই কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংসদ মোবাশ্বের আলম যদি সত্যিই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ হন, তাহলে তাঁর সামনে সুযোগ রয়েছে—কথার পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার প্রমাণ করার। অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান, দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা এবং সমালোচনার প্রতি সহনশীলতা নিশ্চিত করাই হবে তাঁর জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
কারণ, জনগণ কোনো ‘খলিফা’ চায় না, যারা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে। জনগণ চায় এমন নেতৃত্ব, যেখানে ক্ষমতা থাকবে দায়িত্বের সঙ্গে, রাজনৈতিক আনুগত্য থাকবে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে, আর জনপ্রতিনিধিত্ব থাকবে জনগণের কাছে জবাবদিহির অধীনে।
নাঙ্গলকোটে ‘চার খলিফা’র গল্প যতই মুখরোচক হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষ গল্পের চেয়ে কাজের হিসাবই দেখতে চাইবে।

আপনার মতামত লিখুন