কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ জলিপুরের ‘জলি বাটপাড়’ গ্রামবাংলায় ‘জলি বাটপাড়’ নামে লোকমুখে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশ আমল কিংবা তারও আগে মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘জলি’ বা ‘জুলি’ নামের এক ধূর্ত প্রতারকের গল্প।
সেই জলি এমন এক চরিত্র, যে প্রথমে মিষ্টি কথায় মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত, পরে কৌশলে সর্বস্ব হাতিয়ে নিত। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে এটি এক ব্যঙ্গাত্মক উপাধিতে পরিণত হয়েছে। এখনো ধূর্ত, কৌশলী ও প্রতারণায় সিদ্ধহস্ত কোনো ব্যক্তিকে এই বিশেষণ দেওয়া হয়।
সেই জলির চরিত্রে একজনকে পাওয়া গেছে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম জলিপুরে।
এই গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে এমন সব নাটকীয় ও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা দেখে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ইতিহাসের সেই ‘জলি বাটপাড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
একটি সূত্রে আমরা জানতে পারি, আলমগীর সম্পত্তির লোভে নিজের জীবিত মেয়ের নামে ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ বা মৃত্যু সনদ তুলেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। এই তথ্যের সত্যতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা। অসুস্থ স্ত্রীর বদলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে সরকারি চাকরিতে প্রক্সি দেওয়া, এলাকার সাধারণ মানুষকে সুদের জালে ফাঁসিয়ে সম্পত্তি আত্মসাৎ, ব্ল্যাংক চেক ও স্ট্যাম্পের সুযোগ নিয়ে মামলাবাজি, গৃহবধূকে মিথ্যা মামলায়
জলিপুরের ‘জলি বাটপাড়’ শুরু করেন তিনি।
গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এ বিষয়ে বলাবলি করতেন।
আলমগীরের সঙ্গে একবার এ বিষয়ে আলাপ হয়। গল্পের ছলে জানতে চাইলে তিনি জানান, সন্তান মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পিতা এবং মাতা উভয়ই বাধ্যতামূলক অংশীদার হন। এতে করে আয়েশা জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ধারণা করা হচ্ছে, মেয়ের নামে কেনা সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার লোভেই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন আলমগীর।
অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য জানতে চাইলে আলমগীর বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তিনি জীবিত মেয়ের নামে মৃত্যু সনদ তোলার কথা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও অন্য ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাই রাগ করে মেয়ের নামে মৃত্যু সনদ তুলেছেন।
কিন্তু জীবিত ব্যক্তির নামে মৃত্যু সনদ ইস্যু কিভাবে হলো, এ বিষয়ে কথা হয় বাইশগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মনোহরগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত শাহাদাত বলেন, ‘আলমগীর সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমাকে ফোন করে জানান যে তাঁর মেয়ে মারা গেছে এবং একটি মৃত্যু সনদ খুবই দরকার। তিনি তাড়াহুড়া করায় আমরাও আর বিষয়টি যাচাই করিনি। মৃত্যুসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও তিনি দেননি।’
স্ত্রীর চাকরিতে দেড় যুগ ধরে প্রক্সি : অনুসন্ধানে আলমগীরের জালিয়াতির আরেক তথ্য পাওয়া যায় স্ত্রীর চাকরিতে প্রক্সি দেওয়াকে কেন্দ্র করে। জানা গেছে, আলমগীরের প্রথম স্ত্রী সেলিনা আক্তার ২০০৬ সালের ১৫ জানুয়ারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগ দেন। মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। কিন্তু স্ত্রীর সরকারি চাকরিটি টিকিয়ে রাখতে নিজেই সেই দায়িত্ব পালন শুরু করেন। আর এক দুই বছর নয়, টানা ১৮ বছর বা দেড় যুগ ধরে এই ‘গুরুদায়িত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কথা হয় একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, সেলিনা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই টিকাদানকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কাজের এলাকাগুলো হলো—বাইশগাঁও ইউনিয়নের ইপিআই সাব ব্লক ক/১ আতাকরা (সেফালী মেম্বার বাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ক/২ শরীফপুর (প্রাথমিক বিদ্যালয়), ইপিআই সাব ব্লক খ/১ নোয়াগাঁও দক্ষিণ (হাসান মাস্টারের বাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক খ/২ নোয়াগাঁও উত্তর (বেপারীবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক গ/১ বুরপৃষ্ঠ (সিসি), ইপিআই সাব ব্লক গ/২ চিলুয়া (কাজীবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ঘ/১ পেয়ারাতলী (দাসবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ঘ/২ জলিপুর (কবিরাজবাড়ি)।
এই কর্মকর্তা আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে স্ত্রীর চাকরিতে প্রক্সি দিয়ে যাচ্ছেন আলমগীর। ১৮ বছর ধরেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তীর কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। তবে ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ঘটনাটি তদন্ত করতে সম্প্রতি সরেজমিনে যান ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী। পরে তিনি জানান, আলমগীরের প্রথম স্ত্রী সেলিনা আক্তার চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁকে ঘরের একটি অন্ধকার কোণে অনেকটা জিম্মি অবস্থায় রাখা হয়েছে। ঠিকমতো চিকিৎসাও পাচ্ছেন না। প্রতিবেশীরা আলমগীরের অত্যাচারের ভয়ে সেলিনার বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, সেলিনাকে তাঁরা কখনো দেখতে পান না। সারাক্ষণ তাঁকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেলিনার সরকারি চাকরির সম্পূর্ণ টাকা আলমগীর নিজেই আত্মসাৎ করেন। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সেলিনার কোনো চিকিৎসার উদ্যোগ নেননি। এমনকি সেলিনার গর্ভে জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলেটিও মানসিক প্রতিবন্ধী। মায়ের সঙ্গে ঘরবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে সে-ও।
ব্ল্যাংক চেকে ফেঁসে কারাবন্দি নারী, বিপদে আরো অনেকে : সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, আলমগীর হোসেন এলাকায় সুদের কারবারি হিসেবে বহুল পরিচিত। তবে সুদ কারবারের নেপথ্যে তিনি মানুষ ঠকানোয় সিদ্ধহস্ত। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ঋণ দেওয়ার সময় গ্রহীতার কাছ থেকে সই করা ব্ল্যাংক চেক ও খালি দলিল নিয়ে রাখেন আলমগীর। পরে সুদসহ ঋণের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলেও ব্ল্যাংক চেকে ইচ্ছামতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা করেন।
লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা মৃত কালী কুমার সাহার ছেলে চন্দন কুমার সাহা অভিযোগ করেন, বিদেশে থাকার সময় তাঁর স্ত্রী ববিতা সাহা আলমগীরের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে নিয়মিত সুদ পরিশোধের পরও তাঁর কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই চেক ব্যবহার করে আলমগীর আমার স্ত্রীর নামে মামলা করে। সেই মামলায় আমার স্ত্রী গ্রেপ্তার হয়ে ১১ মাস ধরে কারাবন্দি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, টাকা পরিশোধের পরও চেক ফেরত পাইনি। পরে সেই চেকে বড় অঙ্কের টাকা বসিয়ে মামলা করেছে আলমগীর।
বাইশগাঁও ইউনিয়নের ডাবুরিয়া গ্রামের উত্তর পাটোয়ারীবাড়ির হারুন অর রশিদের ছেলে রুবেল হোসেন বলেন, এক লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা সুদ দিতে হতো। পরে টাকা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় তাঁকে মারধর করা হয় এবং এক শতক জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়।
রুবেল আরো বলেন, ‘আমার বাবাকে টাকা নিয়ে চাপ দেওয়া হয়েছে। একাধিকবার ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। আমার আরেক চাচা আবদুল হকের কাছ থেকেও টাকা না দিতে পারার কারণে ২ শতক জায়গা জোরপূর্বক লিখে নেয় আলমগীর।’
ডাবুরিয়া গ্রামের হাজিবাড়ির মৃত আতরের জামানের ছেলে আমির হোসেন বলেন, ‘আমি বিপদে পড়ে আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিই। আমি এক লাখ ৫০০ টাকা পরিশোধ করার পরও নাকি তাঁর টাকা শোধ হয়নি। এখন তিনি আরো টাকার জন্য আমার বাড়িতে পুলিশ নিয়ে আসেন।’
বাইশগাঁও ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের হায়দার আলী বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১২.৫ শতক জমি তাঁর নামে লিখে দিতে বলা হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় পরে আমার নামে ১৭ লাখ টাকার মামলা দেওয়া হয়।’
আতাগরা গ্রামের সেলিম বলেন, ‘দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। সুদ দিতে দিতে ১৩ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করেছি। এখনো সুদের চাপ রয়েছে। আমার চারটি ব্ল্যাংক চেক তাঁর কাছে আছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, জলিপুর, ডাবুরিয়া, আতাগরা, তালতলা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের অনেক পরিবার মামলা ও আর্থিক চাপের কারণে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যদিকে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
একাধিক ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, আলমগীর হোসেনের প্রধান হাতিয়ার হলো মামলা। তাঁর দাবি মেনে না নিলে চেক ডিস-অনার বা অন্যান্য অভিযোগে মামলা করা হতো।
সরেজমিনে গেলে ভুক্তভোগীরা আলমগীরের দেওয়া ‘কিস্তি আদায় কার্ড’ দেখান। সমবায় সমিতি নামে প্রিন্ট করা এসব কার্ডের এক পৃষ্ঠায় ঋণগ্রহীতার নাম-ঠিকানা এবং পাঁচটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। অপর পৃষ্ঠায় ঋণের পরিমাণ, মোট কিস্তি, সাপ্তাহিক কিস্তির পরিমাণসহ বিস্তারিত তথ্য লেখা রয়েছে। জলিপুর গ্রামে জমি কিনে অফিস বানিয়ে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন আলমগীর।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আলমগীর সবকিছু অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়। বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
প্রশাসনের ভাষ্য : জানতে চাইলে মনোহরগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক মাকসুদ আহমদ জানান, এ ধরনের ঘটনা তাঁদের জানা নেই। কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে এলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ জলিপুরের ‘জলি বাটপাড়’ গ্রামবাংলায় ‘জলি বাটপাড়’ নামে লোকমুখে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশ আমল কিংবা তারও আগে মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘জলি’ বা ‘জুলি’ নামের এক ধূর্ত প্রতারকের গল্প।
সেই জলি এমন এক চরিত্র, যে প্রথমে মিষ্টি কথায় মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত, পরে কৌশলে সর্বস্ব হাতিয়ে নিত। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে এটি এক ব্যঙ্গাত্মক উপাধিতে পরিণত হয়েছে। এখনো ধূর্ত, কৌশলী ও প্রতারণায় সিদ্ধহস্ত কোনো ব্যক্তিকে এই বিশেষণ দেওয়া হয়।
সেই জলির চরিত্রে একজনকে পাওয়া গেছে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম জলিপুরে।
এই গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে এমন সব নাটকীয় ও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা দেখে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ইতিহাসের সেই ‘জলি বাটপাড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
একটি সূত্রে আমরা জানতে পারি, আলমগীর সম্পত্তির লোভে নিজের জীবিত মেয়ের নামে ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ বা মৃত্যু সনদ তুলেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। এই তথ্যের সত্যতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা। অসুস্থ স্ত্রীর বদলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে সরকারি চাকরিতে প্রক্সি দেওয়া, এলাকার সাধারণ মানুষকে সুদের জালে ফাঁসিয়ে সম্পত্তি আত্মসাৎ, ব্ল্যাংক চেক ও স্ট্যাম্পের সুযোগ নিয়ে মামলাবাজি, গৃহবধূকে মিথ্যা মামলায়
জলিপুরের ‘জলি বাটপাড়’ শুরু করেন তিনি।
গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এ বিষয়ে বলাবলি করতেন।
আলমগীরের সঙ্গে একবার এ বিষয়ে আলাপ হয়। গল্পের ছলে জানতে চাইলে তিনি জানান, সন্তান মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পিতা এবং মাতা উভয়ই বাধ্যতামূলক অংশীদার হন। এতে করে আয়েশা জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ধারণা করা হচ্ছে, মেয়ের নামে কেনা সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার লোভেই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন আলমগীর।
অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য জানতে চাইলে আলমগীর বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তিনি জীবিত মেয়ের নামে মৃত্যু সনদ তোলার কথা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও অন্য ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাই রাগ করে মেয়ের নামে মৃত্যু সনদ তুলেছেন।
কিন্তু জীবিত ব্যক্তির নামে মৃত্যু সনদ ইস্যু কিভাবে হলো, এ বিষয়ে কথা হয় বাইশগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মনোহরগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত শাহাদাত বলেন, ‘আলমগীর সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমাকে ফোন করে জানান যে তাঁর মেয়ে মারা গেছে এবং একটি মৃত্যু সনদ খুবই দরকার। তিনি তাড়াহুড়া করায় আমরাও আর বিষয়টি যাচাই করিনি। মৃত্যুসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও তিনি দেননি।’
স্ত্রীর চাকরিতে দেড় যুগ ধরে প্রক্সি : অনুসন্ধানে আলমগীরের জালিয়াতির আরেক তথ্য পাওয়া যায় স্ত্রীর চাকরিতে প্রক্সি দেওয়াকে কেন্দ্র করে। জানা গেছে, আলমগীরের প্রথম স্ত্রী সেলিনা আক্তার ২০০৬ সালের ১৫ জানুয়ারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগ দেন। মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। কিন্তু স্ত্রীর সরকারি চাকরিটি টিকিয়ে রাখতে নিজেই সেই দায়িত্ব পালন শুরু করেন। আর এক দুই বছর নয়, টানা ১৮ বছর বা দেড় যুগ ধরে এই ‘গুরুদায়িত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কথা হয় একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, সেলিনা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই টিকাদানকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কাজের এলাকাগুলো হলো—বাইশগাঁও ইউনিয়নের ইপিআই সাব ব্লক ক/১ আতাকরা (সেফালী মেম্বার বাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ক/২ শরীফপুর (প্রাথমিক বিদ্যালয়), ইপিআই সাব ব্লক খ/১ নোয়াগাঁও দক্ষিণ (হাসান মাস্টারের বাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক খ/২ নোয়াগাঁও উত্তর (বেপারীবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক গ/১ বুরপৃষ্ঠ (সিসি), ইপিআই সাব ব্লক গ/২ চিলুয়া (কাজীবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ঘ/১ পেয়ারাতলী (দাসবাড়ি), ইপিআই সাব ব্লক ঘ/২ জলিপুর (কবিরাজবাড়ি)।
এই কর্মকর্তা আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে স্ত্রীর চাকরিতে প্রক্সি দিয়ে যাচ্ছেন আলমগীর। ১৮ বছর ধরেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তীর কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। তবে ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ঘটনাটি তদন্ত করতে সম্প্রতি সরেজমিনে যান ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী। পরে তিনি জানান, আলমগীরের প্রথম স্ত্রী সেলিনা আক্তার চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁকে ঘরের একটি অন্ধকার কোণে অনেকটা জিম্মি অবস্থায় রাখা হয়েছে। ঠিকমতো চিকিৎসাও পাচ্ছেন না। প্রতিবেশীরা আলমগীরের অত্যাচারের ভয়ে সেলিনার বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, সেলিনাকে তাঁরা কখনো দেখতে পান না। সারাক্ষণ তাঁকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেলিনার সরকারি চাকরির সম্পূর্ণ টাকা আলমগীর নিজেই আত্মসাৎ করেন। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সেলিনার কোনো চিকিৎসার উদ্যোগ নেননি। এমনকি সেলিনার গর্ভে জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলেটিও মানসিক প্রতিবন্ধী। মায়ের সঙ্গে ঘরবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে সে-ও।
ব্ল্যাংক চেকে ফেঁসে কারাবন্দি নারী, বিপদে আরো অনেকে : সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, আলমগীর হোসেন এলাকায় সুদের কারবারি হিসেবে বহুল পরিচিত। তবে সুদ কারবারের নেপথ্যে তিনি মানুষ ঠকানোয় সিদ্ধহস্ত। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ঋণ দেওয়ার সময় গ্রহীতার কাছ থেকে সই করা ব্ল্যাংক চেক ও খালি দলিল নিয়ে রাখেন আলমগীর। পরে সুদসহ ঋণের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলেও ব্ল্যাংক চেকে ইচ্ছামতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা করেন।
লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা মৃত কালী কুমার সাহার ছেলে চন্দন কুমার সাহা অভিযোগ করেন, বিদেশে থাকার সময় তাঁর স্ত্রী ববিতা সাহা আলমগীরের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে নিয়মিত সুদ পরিশোধের পরও তাঁর কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই চেক ব্যবহার করে আলমগীর আমার স্ত্রীর নামে মামলা করে। সেই মামলায় আমার স্ত্রী গ্রেপ্তার হয়ে ১১ মাস ধরে কারাবন্দি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, টাকা পরিশোধের পরও চেক ফেরত পাইনি। পরে সেই চেকে বড় অঙ্কের টাকা বসিয়ে মামলা করেছে আলমগীর।
বাইশগাঁও ইউনিয়নের ডাবুরিয়া গ্রামের উত্তর পাটোয়ারীবাড়ির হারুন অর রশিদের ছেলে রুবেল হোসেন বলেন, এক লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা সুদ দিতে হতো। পরে টাকা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় তাঁকে মারধর করা হয় এবং এক শতক জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়।
রুবেল আরো বলেন, ‘আমার বাবাকে টাকা নিয়ে চাপ দেওয়া হয়েছে। একাধিকবার ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। আমার আরেক চাচা আবদুল হকের কাছ থেকেও টাকা না দিতে পারার কারণে ২ শতক জায়গা জোরপূর্বক লিখে নেয় আলমগীর।’
ডাবুরিয়া গ্রামের হাজিবাড়ির মৃত আতরের জামানের ছেলে আমির হোসেন বলেন, ‘আমি বিপদে পড়ে আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিই। আমি এক লাখ ৫০০ টাকা পরিশোধ করার পরও নাকি তাঁর টাকা শোধ হয়নি। এখন তিনি আরো টাকার জন্য আমার বাড়িতে পুলিশ নিয়ে আসেন।’
বাইশগাঁও ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের হায়দার আলী বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১২.৫ শতক জমি তাঁর নামে লিখে দিতে বলা হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় পরে আমার নামে ১৭ লাখ টাকার মামলা দেওয়া হয়।’
আতাগরা গ্রামের সেলিম বলেন, ‘দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। সুদ দিতে দিতে ১৩ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করেছি। এখনো সুদের চাপ রয়েছে। আমার চারটি ব্ল্যাংক চেক তাঁর কাছে আছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, জলিপুর, ডাবুরিয়া, আতাগরা, তালতলা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের অনেক পরিবার মামলা ও আর্থিক চাপের কারণে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যদিকে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
একাধিক ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, আলমগীর হোসেনের প্রধান হাতিয়ার হলো মামলা। তাঁর দাবি মেনে না নিলে চেক ডিস-অনার বা অন্যান্য অভিযোগে মামলা করা হতো।
সরেজমিনে গেলে ভুক্তভোগীরা আলমগীরের দেওয়া ‘কিস্তি আদায় কার্ড’ দেখান। সমবায় সমিতি নামে প্রিন্ট করা এসব কার্ডের এক পৃষ্ঠায় ঋণগ্রহীতার নাম-ঠিকানা এবং পাঁচটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। অপর পৃষ্ঠায় ঋণের পরিমাণ, মোট কিস্তি, সাপ্তাহিক কিস্তির পরিমাণসহ বিস্তারিত তথ্য লেখা রয়েছে। জলিপুর গ্রামে জমি কিনে অফিস বানিয়ে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন আলমগীর।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আলমগীর সবকিছু অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়। বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
প্রশাসনের ভাষ্য : জানতে চাইলে মনোহরগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক মাকসুদ আহমদ জানান, এ ধরনের ঘটনা তাঁদের জানা নেই। কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে এলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন