মালেকী আমলের দুর্নীতি ও অনিয়ম : আইসিইউতে নাংগলকোট পৌরসভা!
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা বিগত আওয়ামী শাসনামলে সাবেক মেয়রের মালেকী দুর্নীতি ও অনিয়মে এখন আইসিইউতে। বিগত দেড় বছর পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এসব অব্যবস্হা উত্তরনে হিমশিম খাচ্ছেন নাংগলকোটে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল আমিন সরকার। উল্লখ্য, নাংগলকোট পৌরসভা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৩ বছরেও জনগন কাঙ্খিত সেবা দিতে ব্যর্থ। পৌরবাসীকে নাগরিক সেবার বদলে অতিরিক্ত করের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বিগত ১৬ বছর উন্নয়নের নামে লুটপাট ও অনিয়মের কারনে করার রগ্ন পরিনত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পৌরসভায় লাইটিং ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। সড়কগুলোতে খানা-খন্দকে কাঁদা পানি মাড়িয়ে পৌরবাসীকে নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়ে নাকাল হতে হচ্ছে। সাবেক পৌর মেয়র আবুল মালেকের বিরুদ্ধে বাজার ইজারায় খাস আদায়ের নামে কোটি-কোটি ও লাইটিং ব্যবস্থার নামে লক্ষ-লক্ষ টাকা আত্মসাত সহ পর্বতসম অভিযোগ। অর্থের বিনওময়ে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিয়ে মাথাভারী প্রশাসন সৃষ্টি করায় অধিকাংশ কর্মচারীর এখন ২৭ মাসের বেতন বকেয়া। ফলে কর্মচারীরা বেতন না পেয়ে মানববেতর জীবন যাপন করছে। পৌর পার্ক, পৌর কবরস্থান, খেলার মাঠ, সৌন্দর্যবর্ধন, কসাইখানা, বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোন স্থানও নেই এই ফাস্ট ক্লাস পৌরসভায়। যত্রতত্র সড়কের পাশে বর্জ্য ফেলায় সড়কে চলাচলকারী পৌরবাসীসহ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দমবন্ধ পরিবেশ বিদ্যমান। নেই কোন বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যান্ড। যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে বাস, সিএনজি, অটোরিক্সা স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় যানজটে পৌরবাসীকে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাজী মার্কেট সংলগ্ন রেললাইনের পাশে সৌন্দর্য বর্ধনে পানির ফোয়ারা এবং ফুল গাছ রোপণ করা হলেও পরিচর্যার অভাবে তা এখন সৌন্দর্যহানির কারন। পানির ফোয়ারাটি রহস্যজনক কারনে চালু করা হয়নি। উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিস থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত নির্মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাটিও পরিপূর্ণভাবে নির্মাণ নাকরে বিল লুটপাট করা হয়। বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থাকলেও ড্রেনের পানি সরানোর কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক আরসিসি ঢালাইয়ের নামে নিম্নমানের কাজের কারণে সড়ক নির্মাণের ৬ মাসের মধ্যে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নাঙ্গলকোট-বাঙ্গড্ডা সড়কের উত্তরপাড়া হয়ে আল্টা মর্ডাণ হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কটির আরসিসি ঢালাই নিম্নমানের জন্য ৬ মাসের মধ্যে রাস্তটির বিভিন্নস্থানে ভেঙ্গে যায়। হরিপুর দক্ষিণপাড়া খলিফা বাড়ি সংলগ্ন সড়কটি গত প্রায় ২বছর পর্যন্ত ছোট-বড় খানা-খন্দকে বেহাল দশা বিরাজমান পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড দৌলখাঁড় সড়ক থেকে দাউদপুর শাহী ঈদগাহ হয়ে মাস্টার আনিসুল হকের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার সড়কে ইট, সুরকি এবং পিছ উঠে গত ১০ বছর ধরে বেহাল দশা বিরাজ করছে।বর্তমানে সড়কটি দিয়ে হেঁটেও যাতায়াত করা যায় না। পৌরসভার বাজেটে মশক নিধনে লক্ষ-লক্ষ টাকা বরাদ্ধ থাকলেও মশক নিধন ব্যাবস্থা নেই। পৌরসভার বাজারটি হকার এবং ব্যবসায়ীদের দখলে রয়েছে। ভ্রাম্যমান হকারদের দোকানপাট এবং ব্যবসায়ীরা সড়কের পাশে মালামাল রাখায় এসড়কে জানজট লেগেই থাকে।ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা, মিশুক, যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পৌরবাজার যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পৌরবাজারের রেলগেইট, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বটতলা মোড়, নাঙ্গলকোট আফছারুল উলুম সড়ক, রেলগেইটে মাছ তরকারির বাজারে যানজট সবসময় লেগেই থাকে। বটতলা এলাকায় নাঙ্গলকোট থেকে কুমিল্লায় চলাচলকারী সুপার সার্ভিসের বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা এবং গাড়ি গুরানোর কারণে বটতলায় সবসময় যানজট লেগেই থাকে। পৌর বাজারের সাপ্তাহিক, তোহা বাজার, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী, মাছ, চারা বাজার, কসাইখানা, গণশৌচাগার, ৪টি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা স্ট্যান্ড, পানের মহালসহ ১৭টি খাতের ইজারায় খাস কালেকশানের নামে গত সাড়ে ৭ বছর সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল মালেকসহ তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে ১০জন কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৫০লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ।ইশরাত জাহান নামে একজনকে পাম্প চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পৌরসভায় এখনো পাম্পই বসানো হয়নি। তাকে বসিয়ে-বসিয়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে। তার বাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। সোহেল রানা নামে একজনকে বিদ্যুতের হেলপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও সে বিদ্যুতের কিছুই জানে না। অফিস সহায়ক হিসেবে রহিমা নামে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার বাড়ি লাকসাম। মেয়র আবদুল মালেকের দুর সম্পর্কের আত্মীয় এই রহিমা। মেয়রের ভাগিনা নিজাম উদ্দিন কালুকে টিকাদানকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইউছুফ নবী নামে একজনকে জীপ চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ পৌরসভায় কোন জীপ নেই। এমনকি ইউছুফ নবীর ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত নেই। তাকে বসিয়ে-বসিয়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে। পৌরসভায় সড়কে বাতি ও সোলার লাইট বসানোর নামে হয়েছে বড় ধরণের দূর্ণীতি। নিম্নমানের প্রতিটি সোলার লাইটের দাম ২২ হাজার টাকা হলেও টেন্ডারে দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। ৬মাসের মধ্যে অধিকাংশ সোলার লাইট নষ্টসহ অনেক জায়গায় সোলার লাইটের খাম্বা পর্যন্ত নেই। এছাড়া বিভিন্নস্থানে সোলার লাইটের জন্য বেইস ঢালাই দেওয়া হলেও সোলার লাইট না বসিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এধরণের ১শ লাইট স্থাপনের জন্য বেইস ঢালাই দিলেও সোলার লাইট না বসিয়ে পুরো টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। হরিপুর পশ্চিমপাড়া কাজী রিয়াজদের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে সোলার লাইটের বেইস ঢালাই দেওয়া হলেও গত তিন বছরেও সোলার লাইট বসানো হয়নি। হরিপুর উত্তর পাড়া সাবেক কাউন্সিলর বাহারদের মসজিদের পিছনে সোলার লাইটের বেইস ঢালাই দেওয়া হলেও এলাকাবাসী সোলার লাইটের চেহারা আজ পর্যন্ত দেখেনি।পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দাউদপুর গ্রামের মোশারফ হোসেন বলেন, দৌলখাঁড় সড়ক থেকে দাউদপুর শাহী ঈদগাহ হয়ে মাস্টার আনিছুল হকের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার সড়ক গত ১০ বছর ধরে বেহাল দশা বিরাজ করছে। সড়কটিতে কার্পেটিং উঠে ছোট-বড় অসংখ্য খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কটি দিয়ে কোটি-কোটি টাকা লুটপাটসহ বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট হয়েছে।জানা যায়, সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল মালেক ২০১৬ সালের ৫ মার্চ ১মবার মেয়র হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরে ২০২১ সালে ২১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বার পৌরমেয়র হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ৫আগষ্টের পর থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।পৌরসভার প্রধান নির্বাহী মোসাম্মত জুবাইয়া ইয়াসমীন বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পৌর শাখা-২ এর আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন রাস্তা মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে ৬/৭ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। পৌরসভার নিজস্ব জমি না থাকায় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ আল আমিন সরকার বলেন, পৌরসভার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি না হওয়ায় পৌরসভার বর্জ্য ফেলার সম্পত্তি ক্রয়, বাস, সিএনজি চালিত অটোরিক্সার স্ট্যান্ড নির্মাণ, পৌর পার্ক ও পৌর কবরস্থানের জন্য জমি ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পৌরসভার আয় বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। পৌরসভার সক্ষমতা বৃদ্ধি ফেলে পৌরসভার বিভিন্ন সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে।