প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
জেলখানা রাজনীতিবিদদের পাঠশালা, বাছিরের জন্য নতুন অধ্যায়!া
শাহজাহান ভূঁইয়া সাজু ||
জেলখানা রাজনীতিবিদদের জন্য এক বিশেষ পাঠশালা। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বহু প্রথিতযশা রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কেউ কারাগারে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে আরও পরিপক্ব হয়েছেন, কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তবে কারাগারে গেলেই কেউ বড় রাজনীতিবিদ হয়ে যান না; বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের আদর্শ, সাহস ও অবস্থান ধরে রাখার মধ্য দিয়েই একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।খবর পেলাম, এমনই এক রাজনৈতিক পাঠশালায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্টনে নিজ বাসা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে নাঙ্গলকোট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান (ইউনুস সরকারের নির্বাহী আদেশে পদ বাতিল হওয়া) নাজমুল হাসান ভূঁইয়া বাছিরকে।তবে তাঁর গ্রেপ্তারের খবরে আমি মোটেই উদ্বিগ্ন বা বিচলিত নই। কারণ, বাছিরের রাজনৈতিক জীবনে কারাবরণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে।আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের রোষানল থেকে রেহাই পাননি তিনি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামালের) সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে তৎকালীন নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুলের মাধ্যমে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে দমিয়ে রাখা, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা। কিন্তু বাছিরকে দমিয়ে রাখা কি এতটাই সহজ?একদিকে তিনি সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার ভাতিজা, অন্যদিকে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে এলাকায় তাঁর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তাঁকে দমিয়ে রাখার রাজনৈতিক চেষ্টা যতবার হয়েছে, ততবারই তিনি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।লোটাস কামাল বাছিরের হাতেগড়া রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত একই বাড়ির ইউসুফ ভূঁইয়াকে ব্যবহার করে বাছিরের রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করতে চেয়েছিলেন—এমন অভিযোগ ও রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে। কিন্তু সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয়েছিল, তা সময়ই বলে দিয়েছে।বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাছির তিনবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে একটি ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ নির্বাচনে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদেও বিজয়ী হন। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থান প্রমাণ করে, কেবল ক্ষমতার আশীর্বাদ কিংবা দলীয় প্রভাব দিয়ে মানুষের সমর্থনকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তাঁকে ঠেকাতে আবারও ইউসুফ ভূঁইয়াকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আনার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে একদিকে লোটাস কামালের অনুসারী প্রভাবশালী নেতারা ইউসুফের পক্ষে অবস্থান নেন, অন্যদিকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা বাছিরের পাশে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনজন প্রার্থীর মধ্যে ইউসুফ ভূঁইয়া তৃতীয় অবস্থানে থেকে জামানত হারান। ভোটের ফলাফলই সেদিন অনেক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জবাব দিয়েছিল।পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাহী আদেশে দেশের অন্যান্য উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতো নাঙ্গলকোট উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পদও বাতিল হয়। ফলে বাছিরকেও চেয়ারম্যানের পদ হারাতে হয়।৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আত্মগোপনে গেছেন, কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু বাছিরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। গ্রেপ্তারের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ না নিয়ে তিনি দেশে অবস্থান করেছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাহস নাকি পরিস্থিতির প্রতি ভিন্ন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি—তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এটুকু বলা যায়, তিনি আত্মগোপন কিংবা দেশত্যাগের পথ বেছে নেননি।এখানেই বাছিরের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিশেষ দিক সামনে আসে। অতীতে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতি করেও লোটাস কামাল ও তাঁর অনুসারীদের রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি মাথা নত করেননি বলে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন। আজও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকা অপরাধ নয়, ভিন্নমত পোষণ করাও অপরাধ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার বিচার হওয়াও জরুরি। আইনের শাসন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।বাছিরের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে।আমি বিশ্বাস করি, বাছির এই নতুন পরিস্থিতিতেও ভয়কে জয় করার চেষ্টা করবেন। কারাগারের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন কোনো উপলব্ধি যোগ করবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, রাজনৈতিক দমন-পীড়নও শেষ কথা নয়। মানুষের ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতাই একজন রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় শক্তি।কারাগারের দরজা হয়তো সাময়িকভাবে একজন রাজনীতিবিদের পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান কতটা শক্তিশালী, তা নির্ধারণ করে সময় ও জনসমর্থন।বাছিরের জন্য রইল শুভকামনা। নতুন এই অধ্যায়ে তিনি যেন সাহস, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেন।শুভেচ্ছান্তেশাহজাহান ভূঁইয়া সাজুবিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক নেইবার
প্রধান সম্পাদক: জামাল উদ্দিন স্বপন, প্রধান সম্পাদক কর্তৃক শতরূপা প্রিন্টার্স, সালাম কমপ্লেক্স দ্বিতীয় তলা, নিউ মার্কেট কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ৮২, বাইপাস সড়ক মধ্য লাকসাম, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৪, চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন খান্দানি মার্কেট, লাকসাম, কুমিল্লা। মোবাইল: ০১৭১১৯৫০০৪০, ই-মেইল: sobujpotra.info@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ সবুজ পত্র । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত