প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
রাহুর কবলে লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা দাতব্য চিকিৎসালায় া
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
নারী শিক্ষার অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী কুমিল্লা শহরে নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন জানানা হাসপাতাল। যা এখন কুমিল্লা সদর সরকারি হাসপাতালে নবাব ফয়জুন্নেছা ফিমেল ওয়ার্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি লাকসামে প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেছা দাতব্য চিকিৎসালায়। রেজিষ্ট্রি অফিসের পাশে ডেংগার মিল সংলগ্নে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানটি ভূমিদস্যুদের রাহরগ্রাসে হারিয়ে গেছে। জায়গা দখল নিয়ে চলছে মামলা মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক ভানুমতির খেলা।উল্লেখ্য, বিশ্বের একমাত্র মুসলিম মহিলা নবাব, নারী শিক্ষার অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁয়ে ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।অত্যান্ত রক্ষণশীল, ধর্মভিরু, চারটি ভাষায় পারদর্শী কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। নবাব ফয়জুন্নেচ্ছার পিতা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী ও মাতা আরাফাতুন্নেছা চৌধুরানী। যক্ষা আক্রান্ত পিতাকে মাত্র ১০ বছর বয়সে হারিয়ে এতিম হন তিনি। গৃহ শিক্ষক মৌলভী তাইজউদ্দীন ফয়জুন্নেছাকে গড়ে তোলেন একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে। ১৮৬০ সালে ২৬ বছর বয়সে ফুপাতো ভাই জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ১১ বছর তাদের দাম্পত্য জীবনের এক পর্যায়ে মান অভিমান ও শর্ত ভঙ্গের কারণে দূরত্ব সৃষ্টি হয় । প্রতারনায় মাধ্যমে সতীনের সংসারে ১৫ দিনের বসবাস ও বড় মেয়ে আরশাদুন্নেছাকে জোরকরে কেড়ে নিঃসন্তান সতীন নাজমুনন্নেছাকে দেওয়ার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি তিনি। ৫ বছর পশ্চিমগায়ে ৩২ চালা ঘরে তাদের দাম্পত্যজীবন সুখময় ছিলো। কিন্তু পরবর্তী ৬ বছর ছিলো অম্লমধুর। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে আলাদা বা সেপারেশন হলেও তালাক হয়নি।পৈতিক সূত্রে পাওয়া চার আনা জমিদারি ও স্বামীর সম্পদের হিস্যা লাভের মাধ্যমে জমিদারি পরিচালনার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী, ন্যায়পরায়ণ, শিক্ষাপ্রসার ও জনহিতৈষী জমিদার হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন নবাব ফয়জুন্নেচ্ছা চৌধুরানী।উল্লেখ্য, নবাব ফয়জুন্নেছার যখন ১৬ বছর বয়স অর্থাৎ ১৮৫০ সালে কলকাতায় লড ডালহৌসি কতৃক বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ভর্তির শর্ত ছিলো নো মুসলিম ও নো মহিলা। গৃহ শিক্ষক মৌলভী তাজউদ্দীনের কাছে বিষয়টির গভীরতা জেনে নবাব ফয়জুন্নেছার মনে দারুণ পীড়া দেয়। বিয়ের ১০ বছর পর ১৮৭০ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মেধা ও দক্ষতার সাথে তার সকল কর্মকান্ডে শিক্ষাপ্রসার,জনকল্যণ ও শিল্প- সাহিত্য প্রসারে মনোনিবেশ করেন।জমিদারী পরিচালনার মাত্র ৩ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৮৭৩ সালে তিনি কুমিল্লা শহরের নানুয়ার দিঘির পাড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখন শৈলরানী স্কুল হিসাবে পরিচিত। একই বছর তিনি নারীদের জন্য কুমিল্লা শহরের বাদুরতলায় ইংরেজি মাধ্যমে মহিলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখন নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারী বালিকা বিদ্যালয় হিসাবে কুমিল্লা শহরে বহুল পরিচিত। এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়ার জন্মের ৭ বছর পূর্বেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৪ সালে তিনি 'সুর লহরী' ও 'সংগীত সার' নামক দুটি বই বুলেটিন আকারে প্রকাশ করেন। ১৮৭৬ সালে 'রুপ জালাল' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে সাড়া জাগান তিনি। মহিলা কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে স্থান করে নেন ইতিহাসের পাতায়। উল্লেখয় 'রূপ জালাল' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ৪ বছর পর ১৮৮০ সালে বেগম রোকেয়া গ্রহণ করেন।উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল ভূ-সম্পত্তি ও জমিদারীর মালিক নবাব ফয়জুন্নেচ্ছা চৌধুরানী তথাকথিত জমিদারদের মত শোষক ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রজাদরদী প্রজাহিতৈষী ও প্রগতিশীল। কখনো পালকিতে কখনো ঘোড়ায় গাড়ীতে চড়ে জমিদারি পরিদর্শনে বের হতেন।প্রজা সাধারণের দুঃখ কষ্ট নিজের চোখে দেখে লাঘবের চেষ্টা করতেন। নারী পুরুষ সবার জন্য তাঁর দানের হস্ত ছিল প্রসারিত। শুধুমাত্র অর্থকড়ির মধ্যেই তার দান সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মসজিদ, স্কুল,মক্তব, এতিমখানা, পুল কালভাট ও শিল্প সাহিত্যের প্রসারসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আবদান রেখেছেন। তিনি যেমন ছিলেন ধর্মানুরাগী তেমনি ছিলেন সমাজসংস্কারক। তৎকালীন সময়ে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্করকে উপেক্ষা করে তিনি মানুষকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন একজন নারী তার কর্মের মাধ্যমে কিভাবে বিশ্বজয় করতে পারে। নবাব খেতাব প্রাপ্তির বিষয়টি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। তৎকালীন ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলা ম্যাজিস্টেট মিস্টার ডগলাস একটি বিশেষ জনহিতিকর কাজের জন্য অর্থ ঋণ চেয়ে বিভিন্ন জমিদারদের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু এতে কেউ সাড়া না দিলেও নবাব ফয়জুন্নেছা ১লক্ষ টাকা দেন। পরবর্তীতে মি ডাগলাস এই ঋণের টাকা ফেরত দিতে গেলে জমিদার ফয়জুন্নেছা বলেন-- 'ফয়জুন' যা দেয়, তা দান হিসেবে দেয়, কর্জ হিসেবে নয়। ফয়জুন্নেছার এই উদারতার কথা বৃটেনের রাজপ্রাসাদেও আলোচিত হয়। মহারানী ভিক্টোরিয়া খুশি হয়ে এই মহীয়সীকে ১৮৮৯ সালে ' নবাব ' খেতাবে ভূষিত করেন।১৮৯৩ সালে হজ্জপালন করতে গিয়ে মক্কায় মোসপালা মুসাফিরখানা, নাহারে জোবাইদা খাল খনন, মাদ্রাসাই সওলাতিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মক্কা ও মদিনায় প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৭০০ টাকা সহযোগিতা পাঠাতেন। নিজ জমিদারির ১৪ টি মৌজায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালুর পাশাপাশি তিনি কলকাতায় নদিয়ায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বহুলভাবে আলোচিত। লাকসামের পশ্চিমগাঁয়ে তার প্রতিষ্ঠিত হাই মাদরাসাটি এখন নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ হিসেবে ইতিহাসের স্বাক্ষী। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ৬৯ বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। নবাব ফয়জুন্নেসা জনকল্যাণে নিজ বাড়ি সহ ২৯৭ একর জায়গা ওয়াকফ রাহে লিল্লাহ করে যান। সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে যার অধিকাংশই এখন এখন বেদখল হয়ে গেছে।২০১৭ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর পশ্চিম গাঁয়ের বাড়ি সহ ৪.৫৪ একর জায়গা গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যাতে ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর থেকে জাতীয় জাদুঘরে ৯ম শাখা হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরে কর্মকান্ড চলমান। ২০০৪ সালে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নবাব ফয়জুন্নেছাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রধান করেন।সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয় পক্ষ থেকে জাতীয়ভাবে এই মহীয়সী নবাবের জন্ম- মৃত্যু বার্ষিকী পালন ও স্বাধীনতা পদকের বিষয়টি এখন সময়ের দাবী। পাঠ্যপুস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন নবাব ফয়জুন্নেছার জীবনী ও সাহিত্য।
প্রধান সম্পাদক: জামাল উদ্দিন স্বপন, প্রধান সম্পাদক কর্তৃক শতরূপা প্রিন্টার্স, সালাম কমপ্লেক্স দ্বিতীয় তলা, নিউ মার্কেট কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ৮২, বাইপাস সড়ক মধ্য লাকসাম, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৪, চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন খান্দানি মার্কেট, লাকসাম, কুমিল্লা। মোবাইল: ০১৭১১৯৫০০৪০, ই-মেইল: sobujpotra.info@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ সবুজ পত্র । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত